1. bdcnews21@gmail.com : BDC NEWS 21 :
রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:১২ অপরাহ্ন
শিরোনাম :

স্বপ্নের দালাল, সর্বস্বান্ত মানুষ ও জীবনের নির্মম বাস্তবতা

মো. গোলাম ফারুক মজনু | সভাপতি, সম্মিলিত সাংবাদিক পরিষদ (এসএসপি) | সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক বিপ্লবী জনতা
  • প্রকাশিত: রবিবার, ১৬ অগাস্ট, ২০২৬
  • ২৫ বার পড়া হয়েছে

মো. গোলাম ফারুক মজনু | সভাপতি, সম্মিলিত সাংবাদিক পরিষদ (এসএসপি) | সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক বিপ্লবী জনতা:
জীবনের মানে বুঝতে বুঝতে কখন যে জীবনের অর্ধেকটা পথ পেরিয়ে গেছে, কখনো কখনো তা নিজেকেই বিস্মিত করে। শৈশবে জীবন ছিল স্বপ্নের মতো, বড় হয়ে অনেক কিছু করব, পরিবারকে ভালো রাখব, নিজের একটা পরিচয় তৈরি করব, প্রিয় মানুষ গুলোর মুখে হাসি ফুটাব। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বপ্নগুলো বদলেছে, বাস্তবতার রং বদলেছে, মানুষের চেহারা চিনতে শিখেছি, সম্পর্কের হিসাব বুঝতে শিখেছি। তবুও আজও নিজেকে প্রশ্ন করি, জীবন আসলে কী? শুধু জন্ম নেওয়া, বড় হওয়া, অর্থ উপার্জন করা এবং একদিন চলে যাওয়াই কি জীবন? নাকি জীবন হলো প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে একটু ভালো থাকার চেষ্টা, প্রিয় মানুষগুলোর জন্য কিছু করার আকাঙ্ক্ষা এবং আগামী দিনের জন্য একটি নিরাপদ স্বপ্ন বুকে ধারণ করে পথ চলা? হয়তো জীবনের সংজ্ঞা খুঁজতে খুঁজতেই মানুষ একদিন জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যায়। আর তখন বুঝতে পারে, জীবনের সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো, মানুষ স্বপ্ন দেখে বাঁচার জন্য, কিন্তু সেই স্বপ্নের পথেই কখনো কখনো তাকে সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়।

আজকের পৃথিবীতে একটি উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা মানুষের খুব স্বাভাবিক স্বপ্ন। বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণ-তরুণী, শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষিত বেকার কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান প্রতিদিন স্বপ্ন দেখেন বিদেশে যাওয়ার। কেউ ইউরোপে যেতে চান, কেউ আমেরিকায়, কেউ কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে গিয়ে ভালো একটি চাকরি করতে চান। উদ্দেশ্য একটাই, নিজের জীবন বদলানো, পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করা, সন্তানদের ভালোভাবে মানুষ করা এবং বাবা-মায়ের মুখে একটু স্বস্তির হাসি ফোটানো। একজন মানুষ যখন বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি শুধু একটি বিমানের টিকিট কেনেন না, তিনি আসলে নিজের জীবনের নতুন একটি অধ্যায়ের স্বপ্ন কেনেন। তার চোখে থাকে ভবিষ্যতের ছবি, একটি ভালো চাকরি, নিয়মিত বেতন, পরিবারের জন্য একটি সুন্দর বাড়ি, সন্তানের উন্নত শিক্ষা এবং প্রিয়জনদের একটু ভালো রাখার আকাঙ্ক্ষা। এই স্বপ্নের মূল্য তার কাছে লাখ লাখ টাকা হলেও বাস্তবে সেই টাকার মূল্য তার পরিবারের কাছে আরও অনেক বেশি। কারণ সেই অর্থের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে বছরের পর বছর জমিয়ে রাখা সঞ্চয়, কৃষকের গরু-ছাগল বিক্রির টাকা, পৈতৃক সম্পত্তির অংশ বিক্রির অর্থ, মায়ের সঞ্চয়, স্ত্রীর গয়না কিংবা বোনের বহুদিনের জমানো স্বর্ণ। অর্থাৎ একটি পরিবারের বহু বছরের ত্যাগ, কষ্ট এবং ভালোবাসা একত্রিত হয়ে তৈরি হয় একটি মানুষের বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন।

কিন্তু এই স্বপ্নের বাজারেই তৈরি হয়েছে এক নির্মম বাস্তবতা। মানুষের উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের প্রতারণার অভিযোগ, যেখানে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, অতিরঞ্জিত বেতনের প্রলোভন, ভুয়া চাকরির নিশ্চয়তা কিংবা বিদেশে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় বিপুল অর্থ। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই প্রতারণা সবসময় অচেনা বা সন্দেহজনক চেহারার মানুষের মাধ্যমে আসে না। অনেক সময় সামাজিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত, দামি গাড়ি ব্যবহারকারী, বিলাসবহুল জীবন যাপনকারী, চমৎকার পোশাক পরিহিত এবং প্রভাবশালী পরিচয় বহনকারী ব্যক্তিরাও মানুষের কাছে নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যেন তারাই বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। সাধারণ মানুষ তখন বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে বিশ্বাস করে, কথার ওপর ভরসা করে এবং নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটি নিয়ে ফেলে। অথচ সেই বিশ্বাসের আড়ালে যদি প্রতারণা লুকিয়ে থাকে, তাহলে একটি পরিবারের জন্য তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারে না।

কারও কাছে যে পাঁচ লাখ টাকা শুধু একটি অঙ্ক, সেই পাঁচ লাখ টাকা হয়তো একজন কৃষকের জীবনের সমস্ত সঞ্চয়। কারও কাছে দশ লাখ টাকা হয়তো ব্যবসার মূলধন, কারও কাছে তা পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রির শেষ সম্বল, আবার কারও কাছে স্ত্রীর গয়না বিক্রি করে সংগ্রহ করা অর্থ। একজন বাবা হয়তো সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে জমি বিক্রি করেছেন। একজন মা হয়তো সন্তানের বিদেশ যাওয়ার জন্য নিজের গয়না খুলে দিয়েছেন। একজন স্ত্রী হয়তো স্বামীর স্বপ্ন পূরণ হবে এই আশায় নিজের শেষ সম্বলটুকুও তুলে দিয়েছেন। সেই অর্থ যখন প্রতারণার মাধ্যমে হারিয়ে যায়, তখন শুধু একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা পকেট খালি হয় না, খালি হয়ে যায় একটি পরিবারের স্বপ্নের ঘর। তখন প্রতিদিনের সংসার হয়ে ওঠে হিসাবের খাতা, প্রতিটি কথায় উঠে আসে পাওনা টাকার প্রসঙ্গ, ঋণের চাপ, আত্মীয়ের প্রশ্ন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। যে মানুষটি একদিন পরিবারের কাছে আশার প্রতীক ছিলেন, তিনিই একসময় নিজের পরিবারের কাছে অসহায় হয়ে পড়েন। আর এই অসহায়ত্বের যন্ত্রণা কোনো অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।

অর্থনৈতিক প্রতারণার সবচেয়ে বড় ক্ষত অনেক সময় অর্থনীতিতে নয়, মানুষের সম্পর্কের ভেতরে তৈরি হয়। একটি পরিবারের সদস্যরা যখন নিজেদের শেষ সম্বল দিয়ে কোনো স্বপ্নের পেছনে বিনিয়োগ করেন এবং সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়, তখন পরস্পরের প্রতি বিশ্বাসে ফাটল ধরে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শুরু হয় সন্দেহ ও অভিমান, ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের দূরত্ব তৈরি হয়, আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট হয়, কেউ কাউকে দোষারোপ করে, কেউ আবার নিজের সিদ্ধান্তের জন্য নিজেকেই ক্ষমা করতে পারে না। যে পরিবারে একসময় ভবিষ্যৎ নিয়ে হাসি-আনন্দের আলোচনা হতো, সেখানে একসময় ঋণ, টাকা এবং ব্যর্থতার হিসাব নিয়ে তর্ক শুরু হয়। একটি প্রতারণা কখনো কখনো একটি মানুষের জীবন থেকে কয়েক বছর কেড়ে নেয়, কিন্তু তার প্রভাব একটি পরিবারের সম্পর্কের ওপর পড়ে বহু বছর। তাই প্রতারণার ক্ষতি শুধু আর্থিক নয়। এটি সামাজিক, পারিবারিক এবং মানসিকভাবেও গভীর ক্ষত তৈরি করে।

আমাদের সমাজে আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা দরকার, মানুষ কেন এত সহজে এসব স্বপ্নের ফাঁদে পা দেয়? এর উত্তরও আমাদের বাস্তবতার মধ্যেই রয়েছে। বেকারত্ব, সীমিত আয়, দ্রব্যমূল্যের চাপ, পরিবারের দায়িত্ব, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং দ্রুত আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানুষকে ঝুঁকি নিতে বাধ্য করে। একজন শিক্ষিত তরুণ যখন দীর্ঘদিন চাকরি না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন, তখন বিদেশে মাসে কয়েক লাখ টাকা আয়ের প্রস্তাব তার কাছে অবিশ্বাস্য হলেও আশা জাগানিয়া মনে হয়। একজন নিম্ন আয়ের মানুষ যখন দেখে তার পরিচিত কেউ বিদেশে গিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলে ফেলেছে, তখন সেও একই স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। আর সেই স্বপ্নের দুর্বল মুহূর্তটিকেই যদি কেউ প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে সেটি নিছক ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, এটি মানুষের অসহায়ত্বের ওপর নির্মম আঘাত।

তবে এর অর্থ এই নয় যে বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন ভুল। বরং বৈধ ও নিরাপদ পথে বিদেশে কর্মসংস্থান আমাদের অর্থনীতি ও ব্যক্তিজীবন, উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী শ্রমিক ও পেশাজীবীরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন, পরিবারকে স্বাবলম্বী করছেন এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করছেন। সমস্যা স্বপ্নে নয়, সমস্যা হলো সেই স্বপ্নকে ঘিরে প্রতারণা, অনিয়ম এবং অসাধু ব্যবসা। তাই বিদেশে যাওয়ার আগে মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে। চাকরির প্রস্তাব, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান, ভিসা, চুক্তিপত্র, বেতন, কর্মস্থল এবং সংশ্লিষ্ট এজেন্সির বৈধতা যাচাই করা জরুরি। কোনো ব্যক্তি শুধু দামি গাড়ি ব্যবহার করেন, বড় বাড়িতে থাকেন কিংবা সামাজিকভাবে পরিচিত, এটুকু কখনোই তার বিশ্বাস যোগ্যতার প্রমাণ হতে পারে না। কারণ মানুষের চরিত্রের মূল্য গাড়ির দামে, পোশাকের ব্র্যান্ডে কিংবা সামাজিক পরিচিতিতে নির্ধারিত হয় না।

জীবনের এই পর্যায়ে এসে মনে হয়, মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ টাকা নয়, বিশ্বাস। টাকা হারালে মানুষ আবার উপার্জন করতে পারে, সম্পত্তি হারালে আবার গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু একবার বিশ্বাস হারিয়ে গেলে তা ফিরে পাওয়া অনেক কঠিন। একজন মানুষের স্বপ্নের সঙ্গে প্রতারণা করা মানে শুধু তার কাছ থেকে টাকা নেওয়া নয়। তার বিশ্বাসকে হত্যা করা। সেই বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তার বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন এবং পুরো পরিবারের আশা। তাই মানুষের স্বপ্নকে পুঁজি করে যারা প্রতারণার পথ বেছে নেন, তাদের মনে রাখা উচিত, আপনি হয়তো একজন মানুষের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা নিচ্ছেন, কিন্তু সেই টাকার সঙ্গে হয়তো একটি পরিবারের বহু বছরের কষ্ট, ত্যাগ এবং ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে।

জীবন সত্যিই অদ্ভুত। কেউ সারাজীবন একটু ভালো থাকার জন্য সংগ্রাম করে, কেউ পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিজের সুখ বিসর্জন দেয়, কেউ সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিজের শেষ সম্বলটুকুও দিয়ে দেয়। অথচ সেই স্বপ্নের পথেই যদি প্রতারণার দেয়াল দাঁড়িয়ে যায়, তখন মানুষ শুধু অর্থ হারায় না, হারায় নিজের ওপর বিশ্বাস, মানুষের ওপর বিশ্বাস এবং কখনো কখনো জীবনের ওপরও বিশ্বাস। তাই আমাদের সমাজে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষের স্বপ্নকে বিক্রি করা হবে না। বরং স্বপ্ন পূরণের জন্য তৈরি হবে নিরাপদ, বৈধ ও স্বচ্ছ পথ। প্রতিটি মানুষ যেন তার কষ্টার্জিত অর্থের যথাযথ মূল্য পায়, প্রতিটি বিদেশগামী কর্মী যেন প্রতারণা মুক্ত ভাবে তার কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারে এবং কোনো মা যেন সন্তানের বিদেশ যাত্রার জন্য নিজের শেষ গয়নাটি বিক্রি করে পরে প্রতারণার কান্নায় ভেঙে না পড়েন।এই মানবিক প্রত্যাশাই হওয়া উচিত আমাদের সবার।

কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ কত টাকা উপার্জন করল, কত বড় বাড়ি করল কিংবা কত দামি গাড়িতে চলল, জীবনের শেষ হিসাব সেখানে নয়। জীবনের প্রকৃত সাফল্য হলো, নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে অন্যের স্বপ্নকে যেন পদদলিত না করা। মানুষের দুর্বলতাকে সুযোগ হিসেবে নয়, মানবিকতার দায়িত্ব হিসেবে দেখা। আর যারা মানুষের স্বপ্ন দেখিয়ে তার সর্বস্ব কেড়ে নেয়, তাদের জন্য হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন শাস্তি কোনো আদালতের রায় নয়! একদিন নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করা যে, তার বিলাসী জীবনের প্রতিটি ইটের নিচে হয়তো কোনো অসহায় মানুষের কান্না চাপা পড়ে আছে।

মানুষ স্বপ্ন নিয়ে বাঁচে। সেই স্বপ্ন কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
ওয়েবসাইট ডিজাইন: ইয়োলো হোস্ট