
ক্রীড়া প্রতিবেদক
একটি জার্সি, একটি নম্বর আর একজন কিংবদন্তি—লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে যার উপস্থিতি ছিল কোটি মানুষের আবেগের নাম। সেই মেসিই এবার জাতীয় দলের অধ্যায়ে টেনে দিলেন শেষ রেখা। দীর্ঘ ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পর আর্জেন্টিনার জার্সিকে বিদায় জানালেন ফুটবলের এই মহাতারকা।
মেসির বিদায় মানে শুধু একজন ফুটবলারের বিদায় নয়; এটি একটি যুগের সমাপ্তি। যে যুগে তাঁর বাঁ পায়ের জাদুতে বদলে গেছে ম্যাচের গল্প, তাঁর একটি পাসে খুলে গেছে প্রতিপক্ষের রক্ষণ, আর তাঁর গোলের উচ্ছ্বাসে একসঙ্গে কেঁপে উঠেছে গোটা আর্জেন্টিনা।
২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেকের পর শুরু হয়েছিল মেসির দীর্ঘ পথচলা। শুরুটা ছিল স্বপ্নের মতো, কিন্তু পথটা মোটেও সহজ ছিল না। একের পর এক ফাইনালে পরাজয়, সমালোচনা, হতাশা—সবকিছুই সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে।
২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় আক্ষেপ। এরপর কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরপর ব্যর্থতা। একসময় অভিমানে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন মেসি। কিন্তু ভাগ্য তখনও তাঁর জন্য অন্য গল্প লিখে রেখেছিল।
২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয় দিয়ে শুরু হয় মেসির স্বপ্নপূরণের নতুন অধ্যায়। এরপর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই মহাকাব্যিক ফাইনাল। টাইব্রেকারে জয়। আর হাতে বিশ্বকাপ—যে ট্রফির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছিলেন মেসি।
সেই মুহূর্তেই যেন পূর্ণতা পায় তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।
এরপর ২০২৪ সালে আরও একটি কোপা আমেরিকা ট্রফি জিতে আর্জেন্টিনার হয়ে নিজের উত্তরাধিকারকে আরও শক্তিশালী করেন তিনি। ২০২৬ বিশ্বকাপেও দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে এবার শেষ হাসি হাসতে পারেনি আর্জেন্টিনা।
বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে পরাজয়ের পরই মেসি জানান, এবার সময় এসেছে সরে দাঁড়ানোর। নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে চান জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির পরিসংখ্যানও তাঁর মহত্ত্বের সাক্ষী। ২০০-র বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ১২৫ গোলের বেশি করেছেন তিনি। গোলসংখ্যা ও ম্যাচ—দুই ক্ষেত্রেই দেশের ইতিহাসে শীর্ষে মেসি।
তবে সংখ্যায় কি কখনো একজন কিংবদন্তিকে মাপা যায়?
মেসিকে মনে রাখা হবে তাঁর গোলের জন্য, কিন্তু তার চেয়েও বেশি মনে রাখা হবে তাঁর লড়াইয়ের জন্য। বারবার হেরে গিয়েও ফিরে আসার জন্য। সমালোচনার জবাব মাঠে দেওয়ার জন্য। আর সবচেয়ে বেশি মনে রাখা হবে—একটি প্রজন্মের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য।
আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে হয়তো আর দেখা যাবে না সেই পরিচিত ‘১০’। থাকবে না ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়া সেই ক্ষুদ্রকায় জাদুকর। থাকবে না গোলের পর দুই হাত আকাশের দিকে তুলে দাঁড়িয়ে থাকা সেই দৃশ্য।
কিন্তু মেসি চলে গেলেও তাঁর গল্প থেকে যাবে।
থেকে যাবে ২০২২ বিশ্বকাপের সেই রাত। থেকে যাবে কোপা আমেরিকার স্মৃতি। থেকে যাবে অসংখ্য গোল, অ্যাসিস্ট, রেকর্ড আর ট্রফি। আর থেকে যাবে কোটি ভক্তের হৃদয়ে একটাই নাম—
লিওনেল মেসি।
ফুটবল অনেক কিংবদন্তিকে দেখেছে। আরও অনেককে দেখবে। কিন্তু মেসির মতো একজনকে আবার দেখতে কত প্রজন্ম অপেক্ষা করবে—তার উত্তর হয়তো সময়ও জানে না।
বিদায়, মেসি।
বিদায় নয়—আপনার গল্পের পর্দা নামল শুধু আর্জেন্টিনার জার্সিতে। কিংবদন্তির গল্প চলবে আরও অনেক দিন।