
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মানবাধিকার সুরক্ষা জোরদার, জোরপূর্বক গুমকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও দাতার আজীবন ভোগদখলের অধিকার নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়েছে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬,জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়।
গুমের ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড
নতুন জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬-এ গুমকে আমলযোগ্য, অজামিনযোগ্য ও আপস-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
বিলে গুমের ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে গুমের শিকার ব্যক্তি মারা গেলে, অথবা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকলে দায়ী ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। পাশাপাশি সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
গুমের ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধারে আদালত তল্লাশি পরোয়ানা জারি করতে পারবেন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী, অভিযোগকারী, সাক্ষী ও হুইসেলব্লোয়ারদের সুরক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বিলে তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার বিধান রয়েছে। তবে গুমের ঘটনা তদন্তে পৃথক কোনো স্বাধীন তদন্ত সংস্থা গঠনের পরিবর্তে তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপরই রাখা হয়েছে।
নতুন কাঠামোয় মানবাধিকার কমিশন
অন্যদিকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬ পাসের মাধ্যমে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
নতুন কমিশনে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার থাকার বিধান করা হয়েছে। কমিশনে অন্তত একজন নারী এবং জাতীয় সংখ্যালঘু বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অন্তত একজন সদস্য রাখার বিধানও রয়েছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দিতে কমিশনকে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নির্যাতন, হেফাজতে মৃত্যু ও জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধে একটি ন্যাশনাল প্রিভেন্টিভ মেকানিজম ইউনিট প্রতিষ্ঠার বিধানও রাখা হয়েছে।
বিরোধী দলের আপত্তি ও ওয়াকআউট
তবে মানবাধিকার কমিশন বিলের বিভিন্ন বিধান নিয়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা আপত্তি জানান। তাদের অভিযোগ, প্রস্তাবিত আইনে সাধারণ নাগরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের বিধান রাখা হয়েছে।
আপত্তি জানিয়ে বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। এরপর তাদের অনুপস্থিতিতেই বিল দুটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।
সম্পত্তি হস্তান্তরেও নতুন বিধান
একই দিনে সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬ পাস করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্তে কোনো ব্যক্তি তার সম্পত্তি দান বা হস্তান্তর করার পরও জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।
নতুন বিধান অনুযায়ী বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি এবং অন্যান্য যোগ্য দাতা নির্দিষ্ট রক্তসম্পর্কীয় ব্যক্তি বা স্বামী-স্ত্রীর কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর করেও আজীবন ভোগদখলের অধিকার রাখতে পারবেন।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই বিধান প্রচলিত দান, হেবা বা সম্পত্তি হস্তান্তরের অন্যান্য স্বীকৃত পদ্ধতিকে বাতিল করবে না। বরং দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তি ব্যবহারের অধিকারকে আইনি সুরক্ষা দেবে।
তিন আইনে কী পরিবর্তন আসতে পারে
জাতীয় সংসদে পাস হওয়া এই তিনটি আইনের ফলে একদিকে মানবাধিকার কমিশনের কাঠামো ও কার্যক্রমে পরিবর্তন আসবে, অন্যদিকে জোরপূর্বক গুমের ঘটনায় কঠোর শাস্তির বিধান কার্যকর হবে। পাশাপাশি সম্পত্তি দান বা হস্তান্তরের পরও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দাতার আজীবন ভোগদখলের অধিকার আইনি স্বীকৃতি পাবে।
সংসদে বিল তিনটি পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে মানবাধিকার সুরক্ষা, গুমের বিচার এবং সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নতুন আইনি কাঠামো তৈরির প্রক্রিয়া এগিয়ে গেল।